ট্রেনারের মনে কম্পিটেন্সি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের (CBT) প্রভাব

ট্রেনারের মনে কম্পিটেন্সি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের (CBT) প্রভাব

বর্তমান সময়ে কারিগরি শিক্ষায় অনেক বড় একটি পরিবর্তন এসেছে। এই নতুন পরিবর্তনের নাম হলো কম্পিটেন্সি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বা সিবিটি (CBT)। আগের দিনের মতো শুধু বই পড়ে মুখস্থ করার দিন শেষ। এখন একজন শিক্ষার্থী নিজের হাতে কাজ (যেমন- ওয়েল্ডিং করা, কম্পিউটার চালানো বা সেলাই করা) কতটা নিখুঁতভাবে করতে পারছে, সেটাই আসল। কিন্তু এই নতুন নিয়মে পড়াতে গিয়ে শিক্ষকদের বা ট্রেইনারদের মনে কেমন প্রভাব পড়ছে? তাদের কাজ কি সহজ হয়েছে নাকি কঠিন? এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটি জরিপ করেছি। মূল জরিপে ২০ জন ট্রেইনার অংশ নিয়েছিলেন। তাদের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে আমরা ১১০ জন ট্রেইনারের একটি হিসাব বের করেছি। এই সহজ আলোচনাটিতে আমরা জানব, নতুন এই সিবিটি পদ্ধতি আমাদের দেশের ট্রেইনারদের মনে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ১১০ জন ট্রেইনারের দিকে তাকালে বেশ মজার কিছু তথ্য দেখা যায়। এখানে যেমন ২৭ বছর বয়সী তরুণ ট্রেইনার আছেন, তেমনি ৫৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ট্রেইনারও আছেন। মোট ট্রেইনারের মধ্যে ৭৫ শতাংশ (৮২ জন) পুরুষ এবং ২৫ শতাংশ (২৮ জন) নারী। কারিগরি শিক্ষায় নারীদের এই অংশগ্রহণ সত্যিই অনেক ভালো একটি দিক। অংশগ্রহণকারী প্রায় সবারই শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক ভালো—বেশিরভাগই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস। এদের মধ্যে কেউ নতুন কাজ শুরু করেছেন, আবার অনেকেরই ১০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা আছে। এরা সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ট্রেইনার সিবিটি লেভেল-৪ নামের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ আগেই শেষ করেছেন, যা তাদের এই নতুন নিয়মে পড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলেছে।

যেকোনো নতুন কাজের শুরুতে সেটা ভালোভাবে বুঝতে হয়। জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ ট্রেইনার এই নতুন সিবিটি পদ্ধতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানেন। আগে ক্লাসে কী পড়াবেন তা নিয়ে শিক্ষকদের অনেক ভাবতে হতো। কিন্তু সিবিটি নিয়মে আগে থেকেই সবকিছু ঠিক করা থাকে, তাই ট্রেইনারদের কোনো বিভ্রান্তি থাকে না। এই কারণেই ৭০ শতাংশ ট্রেইনার বলেছেন যে, নতুন পদ্ধতিতে পড়াতে গিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ বা মোটিভেশনও বেড়েছে। যখন একজন ট্রেইনার দেখেন যে তার শেখানো কাজ একজন ছাত্র বাস্তবে নিজের হাতে করতে পারছে, তখন তার খুব ভালো লাগে। এই কারণে ৬৫ শতাংশ ট্রেইনারের পড়ানোর স্টাইলেও পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আর শুধু লেকচার দেন না, বরং একজন বন্ধুর মতো ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ শেখান।

কাজের চাপ বা মানসিক শান্তির বিষয়টি যেকোনো পেশায় খুব জরুরি। সিবিটি পদ্ধতির কারণে ৪০ শতাংশ ট্রেইনার বলেছেন তাদের মানসিক চাপ আগের চেয়ে কমেছে। কারণ কী পড়াতে হবে তার একটি পরিষ্কার রুটিন তাদের কাছে থাকে। তবে ২০ শতাংশ ট্রেইনার জানিয়েছেন যে তাদের চাপ একটু বেড়েছে। এর কারণ হলো সিবিটি নিয়মে প্রচুর ফর্ম পূরণ করতে হয় এবং খাতা-কলমের কাজ বা পেপারওয়ার্ক করতে হয়। আগের নিয়মে অভ্যস্ত শিক্ষকদের জন্য এই পেপারওয়ার্ক একটু কষ্টের। তারপরও খুশির খবর হলো, অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ ট্রেইনার জানিয়েছেন পড়ানোর সময় তাদের মনে কোনো ধরনের বাড়তি চাপ বা দুশ্চিন্তা কাজ করে না।

শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্ক কেমন, তার ওপর পড়ালেখার মান নির্ভর করে। আগে ক্লাসে সব ছাত্রের সাথে শিক্ষকের কথা বলার সুযোগ হতো না। কিন্তু সিবিটি পদ্ধতিতে প্রত্যেক ছাত্র তার নিজের মতো করে কাজ শেখে এবং শিক্ষক সবার টেবিলে গিয়ে আলাদাভাবে ভুলগুলো শুধরে দেন। জরিপে ৬০ শতাংশ ট্রেইনার বলেছেন যে, এর ফলে ছাত্রদের সাথে তাদের সম্পর্ক এখন অনেক বেশি ভালো এবং বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে। সিবিটি নিয়মে কোনো ছাত্রকে সরাসরি “ফেল” বলা হয় না, বরং বলা হয় “এখনো দক্ষ নয়”। শিক্ষকের মুখে এই ইতিবাচক কথা শুনে ছাত্রদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। ৬৫ শতাংশ ট্রেইনার মনে করেন, ছাত্রদের মনে সাহস জোগানোর ক্ষেত্রে তারা এখন অনেক বেশি সফল।

পেশাগত পরিচয়ের দিক থেকেও ট্রেইনাররা এখন অনেক বেশি সম্মানিত বোধ করেন। ৫৫ শতাংশ ট্রেইনার বলেছেন, তারা এখন নিজেদের শুধু শিক্ষক নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রির এক্সপার্ট মনে করেন। এই পদ্ধতি তাদের অনেক বেশি সৃজনশীল হতেও সাহায্য করেছে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে আধুনিক মেশিনের অভাব থাকে। তখন ৫০ শতাংশ ট্রেইনার নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে স্থানীয় জিনিসপত্র দিয়ে বিকল্প উপায়ে ছাত্রদের কাজ শেখান। এই যে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, এটি সিবিটি পদ্ধতির একটি বড় অর্জন। ট্রেইনাররা তাদের পড়ানোর ধরনেও অনেক নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন।

আমাদের সমাজের মানুষের চিন্তা-ভাবনাও ট্রেইনারদের মনে প্রভাব ফেলে। ৫৫ শতাংশ ট্রেইনার জানিয়েছেন কাজ করতে গিয়ে তাদের কোনো সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়নি। তবে কিছু ট্রেইনারকে এখনো শুনতে হয় যে, “কারিগরি শিক্ষা শুধু খারাপ ছাত্রদের জন্য” বা “মেয়েরা ভারী কাজের ট্রেনিং দিতে পারবে না।” এ ধরনের কথা মাঝেমধ্যে তাদের মনে কষ্ট দেয়। তারপরও সমাজের একটি বড় অংশ এবং ট্রেইনারদের পরিবার তাদের অনেক বেশি সাপোর্ট দেয়। সব মিলিয়ে ৬৫ শতাংশ ট্রেইনার খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সিবিটি পদ্ধতি তাদের দক্ষতাকে অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিকে আরও ভালো করার জন্য ট্রেইনাররা কিছু সুন্দর পরামর্শ দিয়েছেন। তারা চান, প্রতিদিনের এত এত খাতা-কলমের কাজ বা পেপারওয়ার্ক কমিয়ে মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটারের মাধ্যমে কাজ করার ব্যবস্থা করা হোক। এতে তাদের কাজের চাপ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি তারা নতুন নতুন মেশিন এবং প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য নিয়মিত ছোট ছোট ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। যারা মানসিক চাপে ভোগেন, তাদের জন্য একটু মানসিক সাপোর্টের ব্যবস্থাও তারা চেয়েছেন।

সবশেষে খুব সহজেই বলা যায়, কারিগরি শিক্ষায় সিবিটি একটি দারুণ এবং সফল পদ্ধতি। কিছু ছোটখাটো সমস্যা এবং পেপারওয়ার্কের চাপ থাকলেও, এই পদ্ধতিটি আমাদের দেশের ট্রেইনারদের অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, বন্ধুভাবাপন্ন এবং স্মার্ট করে তুলেছে। খাতা-কলমের কাজের চাপ যদি একটু কমানো যায়, তবে এই হাসিখুশি এবং দক্ষ ট্রেইনাররাই ভবিষ্যতে আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে সেরা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারবেন।